দশম শ্রেনী বাংলা সাহিত্য সঞ্চয়ন ১৯. সিরাজদ্দৌলা - শচীন সেনগুপ্ত

সিরাজদ্দৌলা – শচীন সেনগুপ্ত

লেখক পরিচিতি

বাংলা নাট্যসাহিত্যে শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ছিলেন নিঃসন্দেহে একজন শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় নাট্যকার | ১৯২২ বঙ্গাব্দ ৪ শ্রাবণ  খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামে তার জন্ম হয় |  তাঁর পিতা ছিলেন  সত্যচরণ সেনগুপ্ত | ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়ে শচীন্দ্রনাথ বিদ্যালয় ত্যাগ করেন এবং অনুশীলন সমিতির সাথে সংযুক্ত হন | ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার জাতীয় বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশের পর তিনি বিএ পাস করেন এবং পরে তিনি কটক মেডিকেল স্কুলে চিকিৎসাবিদ্যা ও ময়মনসিংহ জেলায় কবিরাজি  শেখেন | কর্মজীবনের শুরুতে তিনি একটি কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং পরে সাংবাদিকতা পেশার সাথে সংযুক্ত হন | শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেন নাটক রচনায় | তাঁর রচিত ঐতিহাসিক রাজনৈতিক নাটকের মূল বিষয়বস্তু ছিল দেশাত্মবোধ | সামাজিক নাটক রচনাতেও তার সমান দক্ষতা ছিল | তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক নাটক হল – গৈরিক পতাকা, দেশের দাবি, সিরাজদৌলা, রাষ্ট্রবিপ্লব, ধাত্রী পান্না, সবার উপরে মানুষ সত্য, আর্তনাদ ও জয়নাদ ইত্যাদি | রক্ত কমল, ঝড়ের রাতে, তটিনীর বিচার, নার্সিংহোম, মাটির মায়া, কাটা ও কমল, প্রলয় প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য সামাজিক নাটক | এছাড়াও তার কিশোরদের জন্য লেখা নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী ও অনুবাদ আছে |
১৯৬১ সালের ৫ মার্চ নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের জীবনবাসন ঘটে |

সারাংশ

নাট্যাংশের প্রারম্ভেই আমরা দেখতে পাই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সভার বিভিন্ন ঘটনা | সিরাজ তার সভায় কোম্পানির সদস্য ওয়াটস কে তার সভা থেকে বিতাড়িত করেন | যাই কলকাতা তথা আলিনগরের সন্দীপনের বিরুদ্ধে অ্যাডমিরাল ওয়াটসন কলকাতায় সৈন্য সমাবেশের তোড়জোড় করছেন এবং তা নিয়ে ওয়াটসন এর সাথে চিঠির মারফত যোগাযোগ ও করেছেন | নবাব তার গুপ্তচর এর সাহায্যে এই বিষয়ে জানতে  পারলে তৎক্ষণাৎ ওয়াটসকে সভা থেকে বিতাড়িত করেন |

 আবার অন্যদিকে, ফরাসি ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি মসিয়েঁ-লা নবাবের দরবারে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাহায্যের জন্য উপস্থিত হলে, সিরাজ জানান, এ ব্যাপারে কোন সাহায্য করা তার দ্বারা সম্ভব হবে না | কারণ সম্প্রতি কলকাতা ও পুরনিয়ার যুদ্ধে প্রচুর অর্থক্ষয় এবং শক্তিক্ষয় হয়েছে ; উপরন্তু এখন আবার যুদ্ধে জড়িত হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয় |

   এরপরে নবাবের বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে শুরু করেন রাজা রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ এবং মীরজাফর | সিরাজদৌলার পক্ষে থাকেন কেবল মোহনলাল এবং মীর মদন | এর মধ্যেই  মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণও দাখিল করেন | এরপরে সকলে সভা কক্ষ পরিত্যাগ করার পরে কেবল নবাব এবং গোলাম হোসেন থেকে যান সেখানে |

   এমন সময় সেখানে আগমন হয় নবাবের মাসি ঘষেটি বেগমের | তার পুত্র শওকত জঙ্গ কে  নবাবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অপরাধে হত্যা করা হয় | স্বাভাবিকভাবেই ঘষেটি বেগম একজন নবাব বিরোধী | নবাব কে হত্যা করে তার প্রতিশোধ পূরণ করতে চান তিনি | সিরাজকে  মৃত্যুর অভিশাপ দিতে যখন উদ্যত  ঘষেটি  ঠিক তখনই সেখানে প্রবেশ ঘটে সিরাজ বেগম লুৎফা | লুৎফার অনুরোধেই  ঘষেটি কে  অন্দর মহলে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন সিরাজদৌলা | এরপরে সিরাজ বসে বসে পলাশীর আসন্ন যুদ্ধের পরিণতি কল্পনা করতে থাকেন , আর ভাবতে থাকেন ঘসেটির অভিশাপের |

ব্যাখ্যা ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর

1)” জানো এর শাস্তি কি ? ” – বক্তা কে ? কাকে তিনি কেন এই কথা বলেছেন ?

উত্তর- উপরোক্ত উক্তিটির বক্তা হলেন বাংলার  শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদৌলা স্বয়ং |

     নবাব উপরিউক্ত কথাটি বলেছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন প্রতিনিধি ওয়াটসকে |

    অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের প্রতি লেখা পত্রটি নবাবের হাতে পড়লে নবাব বুঝতে পারেন, ওয়াটস  বহুদিন থেকেই সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত | তিনি জানতে পারেন যে, ওয়াটস এর সক্রিয় ভূমিকার দৌলতেই  ইংরেজ কোম্পানি  বাংলায় সৈন্যদল পাঠাতে চলেছে | ওয়াটস এর লেখা প্রতুত্তর চিঠিতে সে  অ্যাডমিরাল ওয়াটসন কে জানায় – ‘নবাবের উপর ভরসা করা অর্থহীন এবং অসম্ভব’ |  ফলে চন্দননগর আক্রমণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে | এছাড়াও  বুঝতে পারেন যে ওয়াটস নবাবের সকল পারিবারিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ক্রমশ অবগত হচ্ছে এবং নিজেদের স্বার্থে সেসব ব্যবহার করছে | তাই সিরাজদৌলা ওয়াটস  কে শাস্তি দেওয়ার অভিপ্রায় এই প্রশ্নটি করেছেন |

2)” কিন্তু ভদ্রতার অযোগ্য তোমরা ”- বক্তা কাকে এরকম কথা বলেছেন? একথা বলার কারণ কি?

উত্তর- উদ্ধৃত উক্তিটি নবাব সিরাজউদ্দৌলা বলেছেন ওয়াটস এর উদ্দেশ্যে |

   ইংরেজদের বিরুদ্ধে কলকাতার যুদ্ধের ফলস্বরুপ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে নবাব এর সন্ধি স্বাক্ষরিত হয় | কলকাতা জয়ের পর নবাব তার নাম রাখেন আলিনগর | এই সন্ধি অনুযায়ী কোম্পানি কোনভাবেই নবাবের বিরুদ্ধে কোন প্রকার যুদ্ধ করবে না | কিন্তু হঠাৎ একদিন সিরাজের হাতে অ্যাডমিরাল  ওয়াটসনের চিঠি এসে  পরে যা অ্যাডমিরাল সিরাজের সভায়  থাকা কোম্পানির প্রতিনিধি ওয়াটস কে লিখেছিলেন | চিঠির মাধ্যমে সিরাজ জানতে পারেন যে কোম্পানি ইতিমধ্যে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এটাও তার জ্ঞাত হয় যে লর্ড ক্লাইভ নবাবের বিরুদ্ধে অনেকদিন থেকে এরকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছেন |

    সর্বোপরি ইংরেজদের ওপর ক্ষুব্দ নবাব, কোম্পানির প্রতিনিধি ওয়াটস-এর ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে, সেই ক্ষোভে প্রকাশ্য সভায় এ রকম কথা বলেন |

3) “ তোমার কথা আমার চিরদিন মনে থাকবে “ –  কার কথা বলা হয়েছে ?  কেন তার কথা মনে থাকবে ?

 উত্তর- উপরিউক্ত উদ্ধৃতাংশে ফরাসি ব্যবসায়ীক  প্রতিনিধি মসিয়েঁ-লা এর কথা বলা হয়েছে |

     ফরাসিদের প্রতি নবাবের বিশেষ ভালোবাসা ছিল | মসিয়েঁ-লা এর  কাছে নবাব তা স্বীকার  করেছেন |       ফরাসিদের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বহুদিনের | সিরাজ এও উল্লেখ করেছেন যে, ফরাসিরা কখনো নবাবদের সাথে খারাপ আচরণ করেননি | কিন্তু ফরাসিরা নবাবের কাছে নিরাপত্তা চাইলে, নবাব অসহায় হয়ে  তাদের ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন | কিন্তু নবাব নিজের মনে অনুতপ্ত হয় | মসিয়েঁলা-র  কাছে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন |

     মসিয়েঁ-লা ও তার বন্ধুত্বের খাতিরে নবাব কে তার আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেন এবং এও জানান যে ফরাসিদের বাংলা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই | সিরাজও  এরমধ্যে  মসিয়েঁলা-র‘ অন্তরের প্রীতি’র পরিচয় পান এবং বলেন তার (মসিয়েঁ-লা) কথা নবাবের চিরকাল মনে থাকবে |

4) “তোমাদের কাছে আমি লজ্জিত “ –  বক্তা কাদের কাছে  এবং কেন লজ্জিত ?

 উত্তর- সিরাজউদ্দৌলা নাট্যাংশে সিরাজ, ফরাসি বণিক মসিয়েঁ-লা কে জানিয়েছেন তিনি ফরাসিদের কাছে লজ্জিত |

   মসিয়েঁ-লা নবাবের সন্নিকটে এসেছিলেন কোম্পানি থেকে চন্দননগর রক্ষার জন্য নবাবের সাহায্যের আশায় | নবাব এবং মসিয়েঁ-লা উভয়ই বাংলার সঙ্গে ফরাসিদের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিষয়ে অবগত | নবাবের সঙ্গে ফরাসিরা যে কখনোই অসৎ ব্যবহার করেননি, সেই কথা উল্লেখ করেন মসিয়েঁ-লা |  জবাবে সিরাজ জানান যে, ইংরেজরা নবাবের অগোচরেই চন্দননগর অধিকার করেছে | কিন্তু সম্প্রতি কলকাতা ও পূর্ণিয়ার যুদ্ধে নবাবের বিপুল লোকক্ষয়  এবং অর্থক্ষয়  হয়েছে | তাছাড়া নবাবের  সভা সদস্যরাও নতুন কোন যুদ্ধের পক্ষে নয় | তাই ফরাসিদের প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকা সত্বেও নবাবের হাত-পা বাঁধা; ইংরেজদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া এই মুহূর্তে নবাবের পক্ষে সম্ভব নয় |

  তার এই অপারগতার জন্যই নবাব ফরাসিদের কাছে ভীষণভাবে লজ্জিত |

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top