Class 9 Bangla নোঙর - অজিত দত্ত

নোঙর – অজিত দত্ত

কবি পরিচিতিঃ

১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার বিক্রমপুরে এক অভিজাত পরিবারে কবির জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম অতুলকুমার দত্ত এবং মাতার নাম হেমনলিনী দেবী। কবি অজিত দত্ত ছিলেন মেধাবী ছাত্র। অজিত দত্ত ছিলেন আদ্যোপান্ত কবি। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা হল আট। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কুসুমের মাস’ এবং শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘শাদা মেঘ কালো পাহাড়’। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর কলকাতায় কবি অজিত দত্তের জীবনাবসান ঘটে।

 

বিষয় সংক্ষেপঃ

অজিত দত্তের ‘শাদা মেঘ কালো পাহাড়’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘নোঙর’ কবিতাটি আয়তনে ছোটো হলেও কবির একটি গভীর জীবন দর্শনের বাহক। “নোঙর” কবিতায় কবি অজিত দত্তের রোমান্টিক মন দূর সাতসমুদ্রে পাড়ি দিতে চায়। কিন্তু বাস্তব জীবনের তটের কিনারে নোঙর পড়ে গেছে অর্থাৎ কবির মন বাধা পড়ে আছে জীবনের দায়দায়িত্ব ও মায়ার বন্ধনে। সুদূরের হাতছানি কবিকে চঞ্চল করে তোলে। সারা রাত-দিন দাঁড় টেনে নোঙরের বন্ধন ছিন্ন করে জীবনতরীকে স্বপ্নজগতে নিয়ে যাওয়ার বৃথা চেষ্টা করেন। নানা স্বপ্ন-কল্পনা-ইচ্ছা জোয়ারের ঢেউয়ের মতো কবির মনের দুয়ারে মাথা ঠুকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়। তারপর আসে ভাটার শোষন- কবি নিরুৎসাহ, নিশ্চেষ্ট হয়ে পড়েন। জীবনের যা কিছু সম্পদ আছে তা নিয়ে কবি পাড়ি দিতে চান সাতসাগরে। কিন্তু পদে পদে আসে বাঁধা। তবু কবির স্বপ্ন দেখা থামে না। স্থির গন্ডিবদ্ধ জীবন থেকে মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং সেই আকাঙ্ক্ষা অপূর্ন থাকার বেদনা “নোঙর” কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে।

 

বহু বিকল্প ভিত্তিক প্রশ্নাবলী

১. নোঙর হল –
(ক) কাছি
(খ) বড়শি
(গ) লৌহদণ্ড
(ঘ) কাছি বাঁধা বড়শির মতো যন্ত্র বা অঙ্কুশ

উত্তরঃ- কাছি বাঁধা বড়শির মতো যন্ত্র বা অঙ্কুশ।

২. ‘তট’ হল –
(ক) তীরভূমি
(খ) স্থলভূমি
(গ) জলাভূমি
(ঘ) মরুভূমি

উত্তরঃ- তীরভূমি।

৩. নোঙর পড়া-র অর্থ –
(ক) বাঁধা পড়া
(খ) গতি বাড়া
(গ) গতি হ্রাস
(ঘ) ভেঙে পড়া

উত্তরঃ- বাঁধা পড়া।

৪. কবি কতক্ষণ দাঁড় টানেন?
(ক) তিন রাত
(খ) সারারাত
(গ) অর্ধ দিন
(ঘ) অর্ধরাত

উত্তরঃ- সারারাত।

৫. কবির এই দাঁড় টানাকে কী মনে হয়েছে?
(ক) মিছে
(খ) বাস্তব
(গ) কঠিন
(ঘ) অযথা

উত্তরঃ- মিছে।

৬. ‘মিছে দাঁড় টানি’-র অর্থ—
(ক) দাঁড় না টানা
(খ) নিষ্ফল দাঁড় টানা
(গ) দাঁড় টানার ভান করা
(ঘ) অবিরাম দাঁড় টানা

উত্তরঃ- নিষ্ফল দাঁড় টানা।

৭. দাঁড় টানা হয়-
(ক) নৌকাকে স্থির রাখার জন্য
(খ) নৌকা ভাসিয়ে রাখার জন্য
(গ) নৌকা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য
(ঘ) নৌকার গতিবেগ ঠিক রাখার জন্য

উত্তরঃ– নৌকা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

৮. ফুলে ফুলে ওঠে-
(ক) জোয়ার জল
(খ) ভাটার ঢেউ
(গ) জোয়ারের ঢেউ
(ঘ) ভাটার টান

উত্তরঃ- জোয়ারের ঢেউ।

৯. জোয়ারের সময় নদীতে—
(ক) জলস্ফীতি ঘটে
(খ) জল কমে যায়
(গ) জল শুকিয়ে যায়
(ঘ) জল উবে যায়

উত্তরঃ- জলস্ফীতি ঘটে।

১০. তরিতে মাথা ঠোকে—
(ক) কবি নিজে
(খ) সাগরের মাছ
(গ) ভাটার জল
(ঘ) জোয়ারের ঢেউ

উত্তরঃ- জোয়ারের ঢেউ।

১১. জোয়ারের ঢেউগুলি তরিতে মাথা ঠুকে—
(ক) ভেঙে যায়
(খ) পালিয়ে যায়
(গ) সমুদ্রে ছোটে
(ঘ) তরি ভেঙে দেয়

উত্তরঃ- সমুদ্রে ছোটে।

১২. কবিতায় উল্লিখিত তরির চালক কে?
(ক) কবির বন্ধু
(খ) ভগবান  
(গ) কবি স্বয়ং
(ঘ) কবির প্রতিযোগী

উত্তরঃ- কবি স্বয়ং।

১৩. জোয়ারের ঢেউগুলিকে কে শোষণ করে?
(ক) সূর্যালোক
(খ) ভাটা
(গ) বড়ো সামুদ্রিক মাছ
(ঘ) জোয়ার স্বয়ং

উত্তরঃ- ভাটা।

১৪. ‘ভাটার শোষণ’ হল—
(ক) ভাটার টান
(খ) জোয়ারের টান
(গ) জলস্ফীতি
(ঘ) জল হ্রাস

উত্তরঃ- ভাটার টান।

১৫. ভাটার শোষণ আহরণ করে—
(ক) জোয়ারের জল
(খ) ভাটার জল
(গ) স্রোতের প্রবল প্রাণ
(ঘ) সমুদ্রের জল

উত্তরঃ- স্রোতের প্রবল প্রাণ ।

১৬. ‘বাণিজ্য তরী’ বাঁধা পড়ে আছে—
(ক) তটের কাছে
(খ) কবির কাছে
(গ) নদীর কাছে
(ঘ) সাগরের কাছে

উত্তরঃ- তটের কাছে।

১৭. কবি কী উদ্দেশ্যে তরি নিয়ে বেরিয়েছেন?
(ক) বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে
(খ) ভ্রমণের উদ্দেশ্যে
(গ) সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে
(ঘ) ক্লান্তি মেটানোর উদ্দেশ্যে

উত্তরঃ- বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে।

১৮. কবির বাণিজ্যতরি কাদের কাছে বাঁধা?
(ক) সময়ের কাছে
(খ) তটের কাছে
(গ) প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে
(ঘ) প্রতিকূলতার কাছে

উত্তরঃ- তটের কাছে।

১৯. ‘বাঁধা পড়ে আছে’-র অর্থ হল –
(ক) বেঁধে রাখা হয়েছে
(খ) তটে আটকে আছে
(গ) নোঙরে বাঁধা অবস্থায় আটকে আছে
(ঘ) জলে আটকে আছে

উত্তরঃ- নোঙরে বাঁধা অবস্থায় আটকে আছে।

২০. ‘মাস্তুলে বাঁধি পাল’, ‘পাল’ অর্থে-
(ক) নৌকার কিনারা
(খ) নৌকার উপর উচ্চ শক্ত দণ্ড
(গ) নৌকার ছই
(ঘ) নৌকার দাঁড়

উত্তরঃ- নৌকার উপর উচ্চ শক্ত দণ্ড।

২১. পাল বাধ্য হয়
(ক) নৌকায়
(খ) দাঁড়ে
(গ) কাছির সঙ্গে
(ঘ) মাস্তুলে

উত্তরঃ- মাস্তুলে।

২২. নৌকা বাঁধা আছে –
(ক) জোয়ারের টানে
(খ) নোঙরের কাহিতে
(গ) মাস্তুলের কাছিতে
(ঘ) দাঁড়ের সাথে।

উত্তরঃ- মাস্তুলের কাছিতে ।

২৩. স্রোতের বিদ্রূপ শোনা যায়—
(ক) সাগরগর্জনে
(খ) জোয়ারের টানে
(গ) ভাটার শোষণে
(ঘ) দাঁড়ের নিক্ষেপে

উত্তরঃ- দাঁড়ের নিক্ষেপে।

২৪. তারার দিকে চেয়ে কবি-
(ক) দিকের নিশানা করেন
(খ) সাগরের নিশানা করেন
(গ) দেশের নিশানা করেন
(ঘ) তটের নিশানা করেন

উত্তরঃ- দিকের নিশানা করেন।

 

অতি-সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন

১. জোয়ারের ঢেউগুলি কেমন আকার ধারণ করে?

উত্তরঃ- জোয়ারের ঢেউগুলি ফুলে ফুলে ওঠে।

২. জোয়ারের ঢেউগুলি কোথায় যায়?

উত্তরঃ- জোয়ারের ঢেউগুলি কবির তরিতে মাথা ঠুকে সমুদ্রের দিকে ছোটে।

৩. ভাটার শোষণ কী করে?

উত্তরঃ- ভাটার শোষণ স্রোতের প্রবল প্রাণ আহরণ করে নেয়।

৪. কবির তরিটি কেমন তরি?

উত্তরঃ- কবির তরিটি পণ্যবাহী তরি বা বাণিজ্যতরি।

৫. বাণিজ্যতরি কী?

উত্তরঃ- ব্যাবসা বা বাণিজ্য করার পণ্যদ্রব্য বা পসরাবাহী নৌকাই বাণিজ্যতরি বলে পরিচিতি।

৬. কবির বাণিজ্যতরি কোথায় বাঁধা পড়ে আছে?

উত্তরঃ- কবির বাণিজ্যতরি জোয়ারভাটায় বাঁধা তটের কাছে বাঁধা পড়ে আছে।

৭. কবির পাড়ি দেওয়ায় বাধা কোথায়?

উত্তরঃ- কবির পাড়ি দেওয়ার একান্ত বাসনা থাকলেও তাঁর নৌকার নোঙর তটের কিনারে পড়ে যাওয়ায় তাঁর যাত্রা বাধাপ্রাপ্ত।

৮. নোঙরের কাছি কী?

উত্তরঃ- নোঙর বাঁধার মোটা দড়িকে নোঙরের কাছি বলে।

৯. চিরকাল কবির নৌকা কীসে বাঁধা থাকে?

উত্তরঃ- চিরকাল নৌকা নোঙরের কাছিতে বাঁধা থাকে।

১০. সাগরগর্জনে কারা কেঁপে ওঠে?

উত্তরঃ- নিস্তব্ধ মুহূর্তগুলি সাগরগর্জনে কেঁপে ওঠে।

১১. ‘নোঙর’ কবিতাটি কার লেখা?

উত্তরঃ- ‘নোঙর’ কবিতাটি কবি অজিত দত্তের লেখা।

১২. অজিত দত্তের একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম লেখো।

উত্তরঃ- অজিত দত্তের একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম ‘কুসুমের মাস’।

১৩. ‘নোঙর’ কবিতাটি কোন্ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত?

উত্তরঃ- ‘নোঙর’ কবিতাটি কবি অজিত দত্ত রচিত ‘শাদা মেঘ কালো পাহাড়’ (১৯৭০) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।

১৪. কবি কোথায় পাড়ি দিতে চান?

উত্তরঃ- কবি দূর সিন্ধুপারে পাড়ি দিতে চান তাঁর তরিখানি নিয়ে।

১৫. নোঙর কী?

উত্তরঃ- নোঙর হল কাছির সঙ্গে বাঁধা লোহার অঙ্কুশ বিশেষ, যার সাহায্যে নৌকা, জাহাজ প্রভৃতি জলযান বেঁধে রাখা হয়।

১৬. নোঙর কোথায় গিয়ে পড়েছে?

উত্তরঃ- নোঙর তটের কিনারে পড়েছে।

১৭. সারারাত কবি কী করেন?

উত্তরঃ- সারারাত কবি দাঁড় টানেন।

১৮. সারারাত ধরে দাঁড় টানাকে কবির কী মনে হয়েছে?

উত্তরঃ- সারারাত ধরে দাঁড় টানাকে কবির ‘মিছে’ বলে মনে হয়েছে।

১৯. কবিতায় উল্লিখিত তরির চালক কে?

উত্তরঃ- কবিতায় উল্লিখিত তরির চালক হলেন কবি স্বয়ং।

 

রচনাধর্মী প্রশ্ন-উত্তর

১. ‘নোঙর’ কবিতাটির নামকরণের তাৎপর্য আলোচনা করো।

উত্তরঃ- ‘নোঙর শব্দটিএসেছে ফারসি ‘লঙ্গর’ শব্দ থেকে। নৌকাকে জলের মধ্যে বেঁধে রাখার ভারী বস্তুবিশেষকে নোঙর বলা হয়। শিকল বা কাছির সঙ্গে লোহার এই নোঙর বেঁধে জলের নীচে ফেলে কাছির অন্য প্রান্ত দিয়ে নৌকা বেঁধে রাখা হয়।

        কবি অজিত দত্তের আলোচ্য কবিতা ‘নোঙর’-এর মাধ্যমে মানবজীবনের বন্ধনের কথা বলা হয়েছে। মানুষের জীবনও নৌকার মতো – সম্পর্কের, কর্মের, দায়িত্ব-কর্তব্যবোধের নোঙরে তা বাঁধা পড়ে থাকে। যারা ভাবুক, সৃষ্টিশীল ও রোমান্টিক মনের মানুষ, তাঁরা জীবনের সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে বাস্তব থেকে দূরে চলে যেতে চান মাঝে মাঝে। তাঁদের মনের স্বপ্ন-কল্পনার জগৎ ও কথিন বাস্তব জগতের মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়। কবির সৃষ্টিশীল মনেও এমনই সংঘাত চলে। সুদূরের আহ্বানকে তিনি উপেক্ষা করতে পারেন না, আবার দৈনন্দিন জীবনের সীমাবদ্ধতা থেকে বেরোতেও পারেন না। তাঁর জীবন যেন নোঙরে বাঁধা পড়া এক নৌকা। তাই এ কবিতায় নোঙর হল বন্ধনেরই প্রতিশব্দ। সেদিক থেকে বিচার করলে আলোচ্য কবিতাটির ‘নোঙর’ নামটি সার্থক ও যথাযথ।   

২. ‘নোঙর’ কবিতায় স্থিতি ও গতির চিত্র কীভাবে ধরা পড়েছে বুঝিয়ে দাও।

উত্তরঃ- কবি অজিত দত্ত রচিত ‘নোঙর’ কবিতায় স্থিতি ও গতির চিত্র সুচারুভাবে আঁকা হয়েছে। সমগ্র কবিতায় ছড়িয়ে আছে স্থিতি ও গতির নানা অনুষঙ্গ। স্থিতি ও গতির দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত মানবহৃদয়ের চিত্র তুলে ধরা আলোচ্য কবিতার অন্যতম ভাববস্তু। বাস্তব জগতের পরিচিত জগতের সীমানায় কবির মন আবদ্ধ থাকতে চায় না। তরি নিয়ে তিনি সাতসমুদ্রপারে যাত্রা করতে চান। কিন্তু অজান্তেই কখন যেন সেই তরি স্থিতিশীলতা নোঙরের কাছিতে বাঁধা পড়ে গেছে—‘নোঙর গিয়েছে পড়ে তটের কিনারে। নোঙর আর তটের উল্লেখের মাধ্যমে কবি বাস্তবজগতের স্থিতিশীলতার চিত্র তুলে ধরেছেন। নিশ্চল নৌকাও স্থিতিকেই চিহ্নিত করে। অন্যদিকে জোয়ারের ঢেউগুলি গতির বার্তা নিয়ে আসে। কবির নিশ্চল জীবনে অভিঘাত হেনে তাকে সচল করতে চায়। তরি তবু চলে না। বদ্ধ তরিতে মাথা ঠুকে অভিমানী ঢেউগুলি ফিরে যায় গতির জগতে। জোয়ারভাটা আসে যায়। নদী আর সমুদ্রের স্রোত চিরচল, গতিশীল তেমন, কবির রোমান্টিক মনও গতিশীল। কিন্তু বাস্তবতার স্থবির পটভূমিতে কবি অসংখ্য বন্ধনে বন্দি, তাঁর জীবনতরি গতিহারা। রাতের নিস্তব্ধ নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলি কবির জীবনে গতির আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে। সারারাত তিনি অবিরাম নিক্ষেপ করে চলেন দাঁড়। কিন্তু তাঁর ব্যর্থ প্রচেষ্টাকে বিদ্রুপ করে স্রোত—“নিস্তব্ধ মুহূর্তগুলি সাগরগর্জনে ওঠে কেঁপে, স্রোতের বিদ্রুপ শুনি প্রতিবার দাঁড়ের নিক্ষেপে।” দাঁড় টেনে টেনে, পাল তুলে, তারার দিকে চেয়ে নিশানা স্থির গতির বার্তা করেও কবি দূর সমুদ্রপারে পাড়ি দিতে ব্যর্থ হন। এই ব্যর্থতার বেদনায় বিষণ্ণ কবি গতিশীল জীবনধর্মে দীক্ষিত বলেই জীবনের কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছনোর আশায় তবু দাঁড় টেনে যান। এভাবেই ‘নোঙর’ কবিতার চিরকালীন গতিময়তার কথা ব্যঞ্জিত হয়েছে।

৩. ‘নোঙর’ কবিতা অবলম্বনে কবির সমুদ্রযাত্রার উদ্যোগ এবং ব্যর্থতার পরিচয় দাও।

উত্তরঃ- ‘নোঙর’ কবিতায় রোমান্টিক কবি অজিত দত্তের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছোনোর অভীপ্সা প্রকাশিত হয়েছে। পারিপার্শ্বিক বন্ধনের সীমানা পেরিয়ে তিনি চলে যেতে চান সমুদ্রযাত্রার উদ্যোগ সপ্তসিন্ধুপারে। জলপথে কবির যাত্রা, তাই নৌকা প্রস্তুত রেখেছেন। সেই নৌকায় সারাজীবনের সঞ্চয় বোঝাই করেছেন, মাস্তুলে পাল বেঁধেছেন, হাতের মুঠোয় ধরেছেন দাঁড়। -“পাড়ি দিতে দূর সিন্ধুপারে নোঙর গিয়েছে পড়ে তটের কিনারে।”কিন্তু নিজের অজান্তে কখন তটের কিনারে নোঙর পড়ে গেছে। কবির সমদূরপিয়াসী মন বাঁধা পড়ে গেছে অদৃশ্য জাগতিক বন্ধনে। গতিশীল জীবনধর্মে দীক্ষিত আশাবাদী কবি থেমে থাকতে চান না, প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করতে তিনি অবিরত জীবনতরীর দাঁড় টানেন। যাত্রার মুহূর্তে দাঁড় বাইতে গিয়ে কবি অনুভব করেন নিজেরই অজান্তে কখন নোঙর পড়ে গেছে তটের কিনারে। কিন্তু তাঁর মন এই বন্ধনকে মেনে নিতে চায় না। তাই কবি সারারাত মিছে দাঁড় টানেন। জোয়ারভাটায় বাঁধা জীবনের এ তটে কবি নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকেন। তাঁর চোখের সামনে ঢেউগুলি দুরন্ত গতির বার্তা নিয়ে আসে আর সাড়া না পেয়ে ফিরে যায়। চঞ্চল স্রোত কবির স্থবিরতাকে বিদ্রুপ করে। নিস্তব্ধ রাতে কবি অবিরাম দাঁড় টেনে চলেন। বারবার ব্যর্থ হয়েও তিনি গন্তব্যে পৌঁছোনোর আশা ও চেষ্টা ত্যাগ করেন না। কিন্তু তিনি জানেন এই দাঁড় টানা মিছে বা বৃথা। অসহায়, নিরুপায় কবির মন ব্যর্থতার বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে।

৪. নোঙর’ শব্দটি কীসের প্রতীক? প্রসঙ্গক্রমে মধ্যবিত্ত মানুষের চাওয়াপাওয়া বিষয়টি কীভাবে পাঠ্য কবিতায় ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।

উত্তরঃ- কবি অজিত দত্ত রচিত ‘নোঙর’ কবিতায় ‘নোঙর’ শব্দটি বন্ধন বা প্রতিবন্ধকতার প্রতীক।

এই বন্ধন অদৃশ্য, উপলব্ধির যোগ্য। আক্ষরিক অর্থে নোঙর নৌকা ইত্যাদি জলযানকে নিশ্চল করে রাখে। তার সঙ্গে কাছি দিয়ে বাঁধা থাকে নৌকা। মানুষের জীবনও নৌকার মতো, নোঙর শব্দটি যার প্রতীক তা বাঁধা থাকে জাগতিক নানা মায়াবন্ধনে। পারিবারিক, সামাজিক নানা বন্ধনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে মানুষ।‘নোঙর’ কবিতায় মধ্যবিত্ত মানুষের চাওয়াপাওয়ার বিষয়টি শিল্পরূপ লাভ করেছে। মধ্যবিত্ত জীবন ও মানসিকতায় সাধ আর সাধ্যের মধ্যে চিরকাল দূরত্ব থেকে যায়। মন যা চায় তা আমরা করে উঠতে পারি না। জীবনযাপনে মধ্যবিত্ত মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। মানুষের সৃষ্টিশীল, কল্পনাপ্রবণ মন দূর সমুদ্রপারে পাড়ি দিতে চায়। কিন্তু পিছুটান আর কর্তব্যের বাঁধন সে সাধ পূরণে বাধা দেয়— মধ্যবিত্ত মানুষের আর্থিক, সামাজিক, মানসিক নানারূপ বাধা চাওয়া পাওয়া আমাদের পথ রোধ করে দাঁড়ায়। গতানুগতিক“পাড়ি দিতে দূর সিন্ধুপারে নোঙর গিয়েছে পড়ে তটের কিনারে।” ‘যাহা চাই ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না’ – এই চাওয়া পাওয়ার দ্বন্দ্বে ক্ষত বিক্ষত হয় মধ্যবিত্ত জীবন। অপ্রাপ্তি বা অতৃপ্তির বেদনা নিঃসঙ্গ রাতে মধ্যবিত্ত মানুষকে বিষণ্ণ করে তোলে। দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতায় একসময়ে সে বুঝে যায় সমস্ত চেষ্টাই আসলে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে, জাগতিক বন্ধন থেকে কিছুতেই তার মুক্তি নেই। কিন্তু তারপরেও জীবনের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর অভীপ্সায় সে জীবনতরীর দাঁড় টেনে যায়।

৫. ‘নোঙর’ কবিতায় সমুদ্র, নদী, নৌকা ও নৌকার অনুষঙ্গগুলির সাহায্যে যে-সমস্ত চিত্রকল্প গড়ে উঠেছে সেগুলি আলোচনা করো।

উত্তরঃ- ‘চিত্রকল্প’ কথাটি নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। চিত্রকল্প হল ‘চিত্রের মতো’ বা ‘কল্পনা’ দ্বারা রচিত চিত্র। এর অন্য নাম বাক্‌প্রতিমা। ‘বাক্’ অর্থাৎ কথা দিয়ে তৈরি একটি অবয়ব।চিত্রকল্প ‘নোঙর’ কবিতায় কবি অজিত দত্ত কথা দিয়ে চমৎকার কিছু ছবি এঁকেছেন। নদী-সমুদ্র, স্রোত-ঢেউ, নৌকা ও নৌকার বিভিন্ন অনুষঙ্গ আলোচ্য কবিতায় বক্তব্যের সহায়ক হয়েছে। যেমন—সমুদ্র-নদী-নৌকা দাঁড়-মাস্তুল-পাল ইত্যাদি মিলে জলপথে যাত্রার একটি পরিবেশ তৈরি করেছে। পাঠকের চোখের সামনে যা একটা অপরূপ ছবি ফুটিয়ে তুলেছে। নোঙর, কাছি, তট স্থবিরতার বা স্তব্ধতার ছবি এঁকে দিয়েছে। জোয়ারের ঢেউয়ের ফুলে ফুলে ওঠা আর তরীতে মাথা ঠুকে ফিরে যাওয়ার মধ্যে মানুষের ব্যর্থতাবোধের চিত্র আরোপিত হয়েছে। ফলে অপূর্ব চিত্রকল্প গড়ে উঠেছে। নিস্তব্ধ মুহূর্তে সাগরের গর্জন, দাঁড়ের নিক্ষেপে স্রোতের বিদ্রুপ আর-একটি অসাধারণ চিত্রকল্প। কবি কয়েকটি জড়প্রকৃতির মধ্যে বা বস্তুর মধ্যে প্রাণসত্তা আরোপ করে তাদের জীবন্ত করে তুলেছেন। ‘বাণিজ্য-তরী’, ‘তরী ভরা পণ্য’, ‘সপ্তসিন্ধুপারে’ প্রভৃতি কথার মধ্যে ফুটে ওঠে কালসমুদ্রে জীবনতরীর প্রবহমানতার ছবি। জলপথ, জলযান আর তার নানা অনুষঙ্গ প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে কবি ব্যঞ্জনাময় এক-একটি চিত্রকল্প অপূর্ব দক্ষতায় নির্মাণ করেছেন। কবিতাটির মর্মার্থ অনুধাবনে এই চিত্রকল্পগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top