Class 9 Bangla খেয়া - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

খেয়া – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবি পরিচিতিঃ-

১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ (ইংরেজি ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে) কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদাসুন্দরী দেবীর চোদ্দোতম সন্তান তিনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মূলত কবি ছিলেন। তাঁর রচিত মৌলিক কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৫২। “ভানুসিংহের পদাবলী”, “কড়ি ও কোমল”, “মানসী”, “সোনার তরী”, “কণিকা”, “পলাতকা”, “শেষলেখা” প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। তিনি মোট তেরোটি উপন্যাস রচনা করেছিলেন। মাত্র ষোলো বছর বয়সে তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস “করুণা” ভারতী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৫টি গান রচনা ও সেগুলিতে সুরারোপ করেছেন। তাঁর রচিত গানগুলি “রবীন্দ্রসংগীত” এবং প্রবর্তিত নৃত্যশৈলী “রবীন্দ্রনৃত্য” নামে পরিচিত। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ তাঁর “গীতাঞ্জলি” কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ভারতীয় হিসেবে রবীন্দ্রনাথই প্রথম নোবেল পুরস্কার পান। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ “বাংলার রবি” শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

বিষয় সংক্ষেপঃ-

একটি নাম না জানা নদী ও তার তীরবর্তী দুটি নাম না জানা গ্রাম এখানে সারা বাংলার পল্লিজীবনের প্রতিনিধিত্ব করেছে। সকাল থেকে সন্ধ্যে নিরন্তর নদীস্রোতে খেয়া নৌকা পারাপার করে। দুটি গ্রামের মানুষ পরস্পরকে চেনে, নদীর ব্যবধান ঘুচিয়ে খেয়া নৌকাই তাদের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করে। দুই গ্রামের মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মিক বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়। অন্যদিকে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে চলে হিংসা-বিদ্বেষ-রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের লড়াই। সোনার মুকুটের লোভে কত রক্তপ্রবাহ ফেনিয়ে উঠে প্রতিমুহূর্তে। আর এইসব সর্বনাশা সংঘাত নিত্য নতুন ইতিহাস রচনা করে। সভ্যতার নতুন নতুন ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কখনও ওঠে সুধা, কখনও বা হলাহল। খেয়া নৌকা অবিরাম নদীস্রোতে চলাচল করে মানবজীবন প্রবাহকে বহমান রাখে। মানবসভ্যতার অনিবার্য প্রবাহকে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের প্রসারিত আঙিনা থেকে অবলোকন করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেখেছেন তা বিবর্তনের পথে পথে নানান বাঁকে প্রবাহিত হয়েছে, এসেছে বিচিত্র উত্থানপতন। ক্ষমতার দত্তে কখনও সে কম্পিত হয়েছে, কখনও আবার হিংসায় উন্মত্ত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে চলা হিংসা-রক্তপাতের কোনো প্রভাব পড়েনা সহজসরল পল্লিবাসীর জীবনে। দুই পারের নদীতটকে জীবনরসে আর্দ্র করে মানবসভ্যতা বয়ে চলেছে অনন্তের উদ্দেশ্যে। নবীনের আগমন ঘটেছে, প্রবীণ চলে গেছে দূরে— কিন্তু তার চলন অবরুদ্ধ হয়নি; ধীর-নিশ্চিত-গতিশীল অথচ নিরুচ্চারিত থেকে মানবসভ্যতার মহৎ প্রবাহ বয়ে চলেছে। শান্ত-স্নিগ্ধ, মাটির গন্ধ-মাখা এই ছবিটিই পৃথিবীর আদি, অকৃত্রিম এবং অপরিবর্তনশীল পল্লিগ্রামের জীবনছবি হিসেবে তুলে ধরেছেন কবি।

 

বহু বিকল্পভিত্তিক প্রশ্নাবলি

১. ‘দুই তীরে দুই গ্রাম আছে___________ ‘। (শূন্যস্থান পূরণ করো)
(ক) অজানা (খ) জানাশোনা (গ) পরিচিত (ঘ) ভ্রান্ত

উত্তরঃ- জানাশোনা।

২. নদীর দুই তীরে কাদের মধ্যে জানাশোনা আছে?
(ক) দুই ভাইয়ের মধ্যে (খ) দুটি গ্রামের মধ্যে (গ) ব্যবসায়ীদের মধ্যে (ঘ) বন্ধুবান্ধবের মধ্যে

উত্তরঃ- দুটি গ্রামের মধ্যে।

৩. খেয়া নৌকা কতক্ষণ নদী পারাপার করে?
(ক) শুধুমাত্র সকালবেলায় (খ) শুধুমাত্র সন্ধ্যাবেলায় (গ) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত (ঘ) সকাল থেকে দ্বিপ্রহর পর্যন্ত

উত্তরঃ- সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।

৪. কবিতায় যে বিশেষ সময়ের উল্লেখ আছে সেটি হল –
(ক) ঊষা (খ) বিকাল (গ) সকাল থেকে সন্ধ্যা/সারাদিন (ঘ) গোধূলি

উত্তরঃ- সকাল থেকে সন্ধ্যা/সারাদিন।

৫. ‘আনাগোনা’ শব্দের অর্থ—
(ক) আসা-যাওয়া (খ) আসা (গ) যাওয়া (ঘ) পূর্বোক্ত কোনোটিই নয়

উত্তরঃ- আসা-যাওয়া।

৬. “পৃথিবীতে কত দ্বন্দ্ব, কত সর্বনাশ– দ্বন্দ্ব শব্দের অর্থ –
(ক) কলহ (খ) ক্ষতি (গ) পূর্ণ (ঘ) শূন্য

উত্তরঃ- কলহ।

৭. পৃথিবীতে দ্বন্দ্ব আর সর্বনাশের ফলে গড়ে ওঠে –
(ক) নতুন নতুন সভ্যতা (খ) নতুন নতুন ইতিহাস (গ) নতুন নতুন মানবজীবন (ঘ) নতুন নতুন প্রাণ

উত্তরঃ- নতুন নতুন ইতিহাস।

৮. নতুন নতুন ইতিহাস গড়ে উঠেছে—
(ক) গ্রামে (খ) শহরে (গ) পৃথিবীতে (ঘ) মানবসমাজে

উত্তরঃ- পৃথিবীতে।

৯. কোন বিষয়ের জন্য পৃথিবীতে নতুন ইতিহাস গড়ে?
(ক) দুঃখ-আনন্দ (খ) চাওয়া-পাওয়া (গ) দ্বন্দ্ব-সর্বনাশ (ঘ) আলো-অন্ধকার

উত্তরঃ- দ্বন্দ্ব-সর্বনাশ।

১০. “______ কত ফুটে আর টুটে!” – শূন্যস্থানে যেটি বসবে সেটি
(ক) নদীস্রোত (খ) সোনার মুকুট (গ) লোহার শিকল (ঘ) সভ্যতার আলো

উত্তরঃ- সোনার মুকুট।

১১. ‘সোনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে!’— ‘টুটে’ শব্দের অর্থ হল –
(ক) খসে পড়ে (খ) যুক্ত হওয়া (গ) আটকে রাখা (ঘ) বেঁধে রাখা

উত্তরঃ- খসে পড়ে।

১২. নব নব সভ্যতার উন্মেষে কী কী তৈরি হওয়ার কথা কবি বলেছেন?
(ক) অর্থ, সম্পদ (খ) হলাহল, সুধা (গ) হিংসা, দ্বেষ (ঘ) প্রশান্তি

উত্তরঃ- হলাহল, সুধা।

১৩. ‘খেয়া’ কবিতাটি কার রচনা?
(ক) সুকুমার রায় (খ) দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ঘ) সুকান্ত ভট্টাচার্য

উত্তরঃ- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

১৪. ‘খেয়া’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলিত?
(ক) কড়ি ও কোমল (খ) পুনশ্চ (গ) চৈতালি (ঘ) নবজাতক

উত্তরঃ- চৈতালি।

১৫. ‘খেয়া’ কবিতাটি কবি কবে রচনা করেছিলেন?
(ক) ১৮ চৈত্র, ১৩০২ বঙ্গাব্দ (খ) ১৮ ভাদ্র, ১৩০২ বঙ্গাব্দ (গ) ১৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০২ বঙ্গাব্দ (ঘ) ২২ শ্রাবণ, ১৩৪১ বঙ্গাব্দ

উত্তরঃ- ১৮ চৈত্র, ১৩০২ বঙ্গাব্দ।

১৬. ‘খেয়ানৌকা পারাপার করে নদীস্রোতে’ –‘’খেয়া’ শব্দটির অর্থ হল
(ক) নৌকা (খ) নৌকার মাঝি (গ) নদী (ঘ) বড়ো জলাশয়

উত্তরঃ- নৌকা।

১৭. খেয়া নৌকার কাজ হল—
(ক) যাত্রীদের বিদেশে পাঠানো (খ) হাটে পাঠানো (গ) পারাপার করা (ঘ) আনন্দ দেওয়া

উত্তরঃ- পারাপার করা।

১৮. ‘পারাপার’ শব্দের অর্থ
(ক) নৌকা পার হওয়ার জন্য প্রদেয় বিশেষ মূল্য (খ) উভয় তীর আছে যার (গ) নদীর তীরের ছোটো নৌকা (ঘ) একপার থেকে অন্য পারে যাওয়া

উত্তরঃ- একপার থেকে অন্য পারে যাওয়া।

১৯. খেয়া নৌকা কোথায় পারাপার করে?
(ক) নদীস্রোতে (খ) যমুনাতে (গ) সাগরে (ঘ) সমুদ্রে

উত্তরঃ- নদীস্রোতে।

২০. খেয়াতে কারা যাওয়া-আসা করে?
(ক) নদী তীরবর্তী দুই গ্রামের মানুষজন (খ) শহরের লোকজন (গ) পণ্যসামগ্রী (ঘ) গ্রাম ও শহরের মানুষ

উত্তরঃ- নদী তীরবর্তী দুই গ্রামের মানুষজন।

২১. খেয়া নৌকার যাত্রীরা কোথায় যায়?
(ক) কেউ ঘরে কেউ বাইরে (খ) কর্মস্থলে (গ) ভ্রমণে (ঘ) শিকারে

উত্তরঃ- কেউ ঘরে কেউ বাইরে।

২২. ‘হলাহল’ শব্দটির অর্থ কী?
(ক) অমৃত (খ) সুন্দর (গ) লাঙল (ঘ) বিষ

উত্তরঃ- বিষ।

২৩. ‘সুধা’ শব্দের অর্থ কী?
(ক) পৃথিবী (খ) সরবত (গ) অমৃত (ঘ) আকাশ

উত্তরঃ- অমৃত।

২৪. ‘দোঁহা-পানে চেয়ে আছে দুইখানি গ্রাম’। —‘দোঁহা’ শব্দের অর্থ হল –
(ক) এক (খ) দুই (গ) দ্বাদশ (ঘ) দশ

উত্তরঃ- দুই।

 

অতি-সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি

১. কে, কবে “খেয়া” কবিতাটি রচনা করেন?

উত্তরঃ- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮ চৈত্র, ১৩০২ বঙ্গাব্দে “খেয়া” কবিতাটি রচনা করেন।

২. কোন্ কাব্যগ্রন্থ থেকে “খেয়া” কবিতাটি গৃহীত?

উত্তরঃ- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বিতীয় পর্বের কাব্য ‘চৈতালি’ কাব্যগ্রন্থ থেকে পাঠ্য ‘খেয়া’ কবিতাটি নেওয়া হয়েছে।

৩. “খেয়া” শব্দের আভিধানিক অর্থ কী?

উত্তরঃ- ‘খেয়া’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হল ‘নদী পারাপারের নৌকা’ অথবা ‘নৌকা বা অন্য জলযানের দ্বারা নদী বা খাল পারাপার’।

৪. ‘খেয়া’ কবিতায় কটি পঙক্তি আছে?

উত্তরঃ- খেয়া কবিতাটিতে মোট ১৪টি পঙক্তি আছে।

৫. খেয়ায় করে যাত্রীরা কোথায় যায়?

উত্তরঃ- ‘খেয়া’ কবিতার যাত্রীরা খেয়া করে নদী পারাপার করে। তারা কেউ নিজেদের ঘর থেকে নৌকায় আসে, আবার কেউ আপন ঘরে ফিরে যায়।

৬. ‘জানাশোনা’ শব্দের মাধ্যমে কী বলা হয়েছে?

উত্তরঃ- গ্রাম্য নদীর দুই তীরের মানুষদের মধ্যে জানাশোনা রয়েছে। একেই কবি দুই তীরের দুই গ্রামের জানাশোনা বলেছেন।

৭. কবিতায় বর্ণিত নদীতটে কী আছে?

উত্তরঃ- কবিতায় বর্ণিত নদীর দুই তীরে বহুকালের চেনাজানা দুটি গ্রাম বিরাজ করছে।

৮. ‘সোনার মুকুট কত টুটে আর ফুটে’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?

উত্তরঃ- বহু রাজা বা রাজবংশের পতন ঘটে এবং সেই সঙ্গে নতুন রাজা বা রাজবংশের উত্থান ঘটে বোঝাতে কবি “সোনার মুকুট কত টুটে আর ফুটে” কথাটি বলেছেন।

৯. সভ্যতার তৃষ্ণা ক্ষুধা কী?

উত্তরঃ- সভ্যতার ‘তৃষ্ণা ক্ষুধা’ বলতে কবি তথাকথিত বিত্তশালী মানুষের লোভ, ভোগ, বস্তুগত সম্পদের প্রাণহীন সংগ্রহকে বুঝিয়েছেন।

১০. কবি ‘ক্ষুধা’ কথাটি কেন ব্যবহার করেছেন?

উত্তরঃ- কবি সভ্যতার বিত্তশালী মানুষের অপরিমেয় লোভের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তাদের ‘লোভ’-কে ক্ষুধার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

১১. ‘হলাহল’ শব্দের অর্থ কী?

উত্তরঃ- ‘হলাহল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হল দেবাসুর কর্তৃক সমুদ্র মন্থনে উত্থিত তীব্র বিষ, কালকূট।

১২. হলাহল কোথা থেকে ওঠে?

উত্তরঃ- দেবাসুর কর্তৃক সমুদ্রমন্থনে উত্থিত বিষ হল হলাহল, কবি কবিতায় ‘হলাহল’ বলতে মানুষের হিংসা-দ্বেষকে বুঝিয়েছেন। ‘হলাহল” হল এ সভ্যতার এক নেতিবাচক দান।

১৩. সুধা কী?

উত্তরঃ- পৌরাণিক অনুষঙ্গে প্রাপ্ত ‘সুধা’ শব্দের অর্থ হল অমৃত, যা পান করে দেবকুল অমরত্ব লাভ করেছিল।

১৪. ‘হলাহল’ ও ‘সুধা’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?

উত্তরঃ- ‘হলাহল’ ও ‘সুধা’ বলতে কবি সভ্যতার সুফল ও কুফলকে বুঝিয়েছেন।

১৫. দুইখানি গ্রাম কোথায় চেয়ে আছে?

উত্তরঃ- দুইখানি গ্রাম ‘দোঁহা-পানে’ অর্থাৎ দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে আছে।

১৬. ‘খেয়া’ কবিতায় কোন নদীর প্রসঙ্গ রয়েছে?

উত্তরঃ- ‘খেয়া’ কবিতায় নাগর নদীর প্রসঙ্গ রয়েছে।

১৭. নাগর নদী কোথায় প্রবাহিত হয়েছে?

উত্তরঃ- নাগর নদী পাতিসরে প্রবাহিত হয়েছে।

১৮. ‘রক্তপ্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া উঠে’ – ‘রক্তপ্রবাহের মাঝে’ কী ফেনিয়ে ওঠে?

উত্তরঃ- ‘রক্তপ্রবাহের মাঝে’ বিভিন্ন রাজশক্তির উত্থান ও পতনের ইতিহাস ফেনিয়ে ওঠে।

 

রচনাধর্মী প্রশ্ন-উত্তর

১. ‘খেয়া’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তরঃ- নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কবিতার ক্ষেত্রে তার বিষয়বস্তু অনুযায়ী নামকরণ হয়ে থাকে।

রবীন্দ্রনাথের ‘চৈতালি’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘খেয়া’ কবিতাটিতে কবি নাগরিক জীবন এবং গ্রামীণ জীবনের তুলনামূলক দুটি ছবি পাশাপাশি তুলে ধরেছেন। এক নাম-না-জানা নদীর দু-পাশে দুটি নাম-না-জানা গ্রাম সারা বাংলার গ্রামজীবনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। গ্রামের সাধারণ মানুষ সহজসরল-অনাড়ম্বরভাবে তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ করে। নাগরিক জীবনের সুবিধা সেখানে নেই, কিন্তু খেয়ানৌকা সেখানে নদীর ব্যবধান ঘুচিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সেতু তৈরি করে।

অন্যদিকে, নাগরিক জীবনে সুখস্বাচ্ছন্দ্যের অভাব নেই, সেখানে অভাব শুধু মানবিক সম্পর্কের। তাই ক্ষমতার লোভে মানুষ সেখানে খুব সহজেই একে অন্যকে রক্তাক্ত করে। এক সাম্রাজ্যের পতনে আর-এক সাম্রাজ্যের উত্থান হয়। তথাকথিত সভ্যতার অগ্রগতিতে মানুষের জীবনযাত্রার যেমন উন্নতি হয় তেমনি তা ডেকে আনে সমাজ ও পরিবেশের ধ্বংসকেও। তাই কবি বলেছেন সভ্যতার উন্নতিতে বিষ এবং অমৃত দুই-ই উঠে আসে।

নাগরিক জীবনের এই উত্থান-পতনে পল্লীগ্রামের জীবন কিন্তু একটুকুও আন্দোলিত হয় না। আবহমান কাল ধরে তাদের জীবনযাত্রা একই ভাবে বয়ে চলে। মানুষে-মানুষে নিবিড় সম্পর্কই গ্রামের জীবনযাত্রার মূলভিত্তি। খেয়ানৌকা তাদের এই সম্পর্কের সূত্র। তাই কবিতাটির ‘খেয়া’ নামকরণ সার্থক ও যথাযথ হয়েছে।

২. ‘সকাল হইতে সন্ধ্যা’ কবি কেন বলেছেন? ‘দুই গ্রাম’ কীসের ব্যঞ্জনা বয়ে এনেছে?

উত্তরঃ- ‘চৈতালি’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘খেয়া’ কবিতার প্রায় প্রথমদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সকাল ও সন্ধ্যার উল্লেখ করেছেন। এখানে ‘সকাল’ হল মানবজীবনের শুরু আর ‘সন্ধ্যা’ সেই জীবনের অন্তিম লগ্নকে স্পষ্ট করে— তাই শব্দ দুটি গভীর ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত। রোমান্টিক কবি তাঁর অন্তর্দৃষ্টিকে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের পানে প্রসারিত করে মানবের জীবনপ্রবাহকে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন। উদাসী কবির সম্মুখে প্রসারিত নদীস্রোত, এপার-ওপারে দুখানি সাধারণ গ্রাম— তারই মাঝে যাত্রীদল নিয়ে খেয়াতরি চলমান। দুটি গ্রাম পরস্পরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে, যেন তারা বহু যুগের চেনাজানা। যাত্রীরা কেউ ঘরে ফিরেছে, কেউ বা ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে গেছে। তাদের আসা-যাওয়া চলেছে নিরন্তর। তথাকথিত সভ্যতা থেকে দূরবর্তী এই গ্রামদুটি পৃথিবীর হিংস্র উন্মত্ততায় বিচলিত নয়। তারা মিলনের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখে নিজেদের অস্ত্বিত্ব বজায় রেখেছে বহমান কাল ধরে। দুটি গ্রাম তাই কবির দৃষ্টিতে প্রবহমান মানবতার প্রতীক । নদীতটে একাকী উদাসী কবি তাই মানবের অনন্ত আসা-যাওয়ার অর্থ শেষত খুঁজে পেয়েছেন।

৩. “এই খেয়া চিরদিন চলে নদীস্রোতে” – ‘খেয়া’ কবিতায় এর মধ্য দিয়ে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

উত্তরঃ- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘খেয়া’ একটি সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা। এখানে কবি গ্রামবাংলার চিরন্তন শান্তিপ্রিয় রূপটির উল্লেখ প্রসঙ্গে উক্তিটি করেছেন।

কবিতাটিতে কবি নাগরিক জীবন ও পল্লিজীবনের ছবি পাশাপাশি তুলে ধরেছেন। কবিতার নাম-না-জানা নদীর দুপাশের নাম-না-জানা দুটি গ্রাম সারা বাংলার পল্লিজীবনের প্রতীক। গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনে সভ্যতার ঢেউ এসে পৌঁছোয়নি। তাই নাগরিক জীবনের সুখস্বাচ্ছন্দ্য তাদের জীবনে নেই কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসার সম্পর্ক আছে। খেয়ানৌকা সেখানে নদীর দুইপারের ব্যবধান ঘুচিয়ে মানুষে-মানুষে সম্পর্কের সেতু তৈরি করে।

অপরদিকে, নাগরিক জীবনে সুখস্বাচ্ছন্দ্য অনেক বেশি, তাই মানুষের পিপাসাও বেশি। নাগরিক মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে প্রকৃতির স্পর্শ আর মানবিক সম্পর্কের বন্ধন। কবি দেখিয়েছেন নগরজীবনে যত উত্থানপতনই হোক না কেন, পল্লিজীবনে তার ঢেউ এসে আঘাত করে না। সেখানে আবহমান কাল ধরে শান্তগতিতে বয়ে চলে মানুষের জীবনযাত্রা। তাই নদীর দুই পাড়ের দুটি গ্রাম গভীর মমতায় একে অন্যের দিকে চেয়ে থাকে। মাঝে থাকা নদীর ব্যবধান ঘুচিয়ে খেয়া নৌকাও আবহমান কাল ধরে একইভাবে মানুষে-মানুষে সম্পর্কের সেতু গড়ে তোলে।     

৪. ‘নূতন নূতন কত গড়ে ইতিহাস’ – পঙ্ক্তিটির গূঢ়ার্থ বিশ্লেষণ করো।

উত্তরঃ- ‘চৈতালি’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘খেয়া’ কবিতা থেকে আলোচ্য কবিতাংশটি নেওয়া হয়েছে, যেখানে মানবসভ্যতার বিবর্তনের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে রোমান্টিক কবি তাঁর অন্তর্দৃষ্টিকে অস্পষ্ট অতীতের শেষতম ক্ষণ পর্যন্ত প্রসারিত করে মানবসভ্যতার শাশ্বত চিত্রে উঠে এসেছে মানবসভ্যতার দীর্ঘ বিবর্তনরেখাটি। কবি দেখেছেন যুগে যুগে মানুষ বহু বিচিত্র ইতিহাস নির্মাণ করে এগিয়ে নিয়ে চলেছে ভবিষ্যতের সভ্যতাটিকে। ধারাটির স্বরূপ খুঁজতে চেয়েছেন। সভ্যতা পর্যবেক্ষণের সেই সামগ্রিক নির্মোহ দৃষ্টি নিয়ে খেয়াঘাটের তটে বসে একাকী কবি উদাস হয়ে দেখেছেন, এপারের গ্রামখানি থেকে মানুষ খেয়া নৌকায় পার হয়েছে। সম্মুখের নদীবক্ষ, আবার কেউ ওপারের গ্রামগূঢ়ার্থ থেকে এসেছে এপারে। খেয়া পারাপারের এই দৃশ্য অবলোকন করতে করতে কবির মন হয়েছে অতীতচারী। তাঁর অন্তর্দৃষ্টিতে ভেসে উঠেছে অখণ্ড মানব ইতিহাসের বিস্তৃত ক্যানভাস। পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় যে বিভিন্ন সময়ে নানা যুদ্ধ-বিগ্রহের মধ্য দিয়ে এক-একটি দেশে রাজশক্তির পালা বদল হয়েছে। সুখ-সম্পদ-ক্ষমতার লোভে মানুষ খুব সহজেই একে অন্যকে আঘাত করেছে। অন্যের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করতে গিয়েই হয়েছে হানাহানির সূত্রপাত। এভাবেই এক সাম্রাজ্যের পতনে অন্য সাম্রাজ্যের উত্থান হয়ে রচিত হয়েছে মানবসভ্যতার নতুন নতুন ইতিহাস।

৫. ‘রক্তপ্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া ওঠে’—সম্প্রসঙ্গ ব্যাখ্যা করো।

উত্তরঃ- ‘খেয়া’ কবিতায় প্রায় মধ্যাংশে মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তির বীভৎসতাকে প্রকাশ করতে রবীন্দ্রনাথ প্রশ্নে প্রদত্ত পঙ্ক্তিটি ব্যবহার করেছেন। ‘চৈতালি’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত আলোচ্য কবিতায় কবি দেখেছেন রাজশক্তির প্রসঙ্গ রণহুংকারে, তাদের জান্তব শক্তিদর্পে কেঁপে উঠেছে পৃথ্বীতল— সর্বনাশের খেলায় তারা মেতে উঠেছে বারবার। অতীতচারী কবি ইতিহাসের ঘটনাক্রমে দৃষ্টিপাত করে দেখেছেন মানবসভ্যতার প্রবাহ যতবার অবরুদ্ধ হয়েছে স্বার্থান্ধ ক্রোধান্মত্ত মানুষের ব্যাখ্যা হিংস্র ছোবলে— ধরণীতল ততবারই রক্তে ভেসে গেছে। মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করে এইসব শক্তি সভ্যতার বুকে অশনিসংকেত নিয়ে হাজির হয়েছে। বিজয়ী আর বিজিতের তরবারিতে রক্তাক্ত হয়েছে সভ্যতার ইতিহাস। কিন্তু তাদের দম্ভ, দর্প চিরস্থায়ী হয়নি। কবি বলেছেন ‘সোনার মুকুট কত ফুটে, আর টুটে!’ অমরত্বের প্রত্যাশায় অবিসংবাদী হওয়ার স্বার্থান্ধ মানুষের দল মসির সাধনা করে না, আপন করে অসিকেই। সেই নিষ্ঠুর পাষাণ হৃদয় সৃষ্টির তাড়না অনুভব করে না, ধ্বংসের উল্লাসে মেতে ওঠে বারবার। তথাপি বৃহৎ জগৎ তাদের মনে রাখে না, তারাও মানবসভ্যতায় রেখে যায় না কোনো অবদান; বরং তারা এ সভ্যতার গতিকে রুদ্ধ করতে চায় বলে তারা সভ্যতার কীটে পরিণত হয়। ফলত সোনার মুকুটের ঔজ্জ্বল্য ও গাম্ভীর্য অর্থহীন হয়ে পড়ে। হাস্যকর অর্থহীন ধ্বংসাত্মক সে রক্তের খেলার মাঝে কবি জীবনের উপসংহার ইতিবাচকতাকে খুঁজে পাননি; বরং বৃহৎ সভ্যতার ক্ষেত্রে সেই ধূসর রক্তাক্ত ইতিহাস গুরুত্বহীন ঘটনারাজি হয়ে কলঙ্কিত করেছে মানবতাকেই।

৬. ‘উঠে কত হলাহল, উঠে কত সুধা’ – কোন প্রসঙ্গে কবি এই মন্তব্যটি করেছেন ব্যাখ্যা করো।

উত্তরঃ- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘চৈতালি’ কাব্যগ্রন্থের ‘খেয়া’ কবিতায় মানবসভ্যতার তথাকথিত অগ্রগতি প্রসঙ্গে উক্ত মন্তব্যটি করেছেন।

        মানুষ যত সুখস্বাচ্ছন্দ্য পেয়েছে, ততই তার মধ্যে আরো বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জেগেছে। সভ্যতার তথাকথিত অগ্রগতি মানুষের হাতে ভয়ংকর অস্ত্রের জোগান দিয়েছে। মানুষ মেতে উঠেছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। এক সাম্রাজ্যের অবসানে সূচনা হয়েছে নতুন সাম্রাজ্যের।

        পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী সমুদ্রমন্থনে হলাহল এবং সুধা অর্থাৎ বিষ ও অমৃত দুই-ই উঠেছিল। কবির মতে সভ্যতার অগ্রগতিতেও তেমনি বিষ এবং অমৃত দুই-ই উঠে এসেছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের যোগ কমে গেছে বলেই নাগরিক জীবনে এত অশান্তি, এত সংঘাত নেমে এসেছে। নাগরিক জীবনের এই পরিণতি কবিকে কষ্ট দিয়েছে। তাই তিনি প্রকৃতির কোলে বেঁচে থাকা পল্লিজীবনের শান্ত-স্নিগ্ধ-মাটির গন্ধমাখা রূপটির উল্লেখ করেছেন। সেখানে সভ্যতার অগ্রগতি তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি বলেই বোধহয় আবহমান কাল ধরে মানুষের সঙ্গে মানুষের মানবিক সম্পর্ক বেঁচে আছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top